মোহাম্মদ আবদুল জলিল যিনি মেজর জলিল নামেই বেশি পরিচিত, বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের অহংকার
৷ তিনি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯নং সেক্টরে, সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী ঘটনাবলীর আলোকে তিনি সত্য প্রকাশে ছিলেন অঙ্গীকারাবদ্ধ।
মেজর জলিল ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী বরিশাল জেলার উজিরপুর থানায় নানার বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। জন্মের তিন মাস আগে তার পিতার মৃত্য হয়। মেজর জলিলের পিতার নাম আলী মিয়া এবং মাতার নাম রাবেয়া খাতুন। ১৯৬০ সালে তিনি উজিরপুর ডব্লিউ বি ইউনিয়ন ইনস্টিটউট থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬১ সালে মেজর জলিল রাওয়াল পিন্ডির মারি ইয়াং ক্যাডেট ইনস্টিটউশন ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আইএ সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে শিক্ষানবীশ অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। অত্যন্ত মেধাবী এবং চৌকস সেনা কর্মকর্তা মেজর জলিল ১৯৬৫ সালে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর পাক-ভারত যুদ্ধে ১২ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অধিনে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন। পড়ালেখার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী মেজর জলিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ব্যাচেলর এবং ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৪ তারিখে অসুস্থ মাকে দেখতে মেজর জলিল তার কর্মস্থল পাকিস্তানের মুলতান থেকে ছুটি কাটাতে বরিশলে নিজ বাড়িতে আসেন। ছুটি শেষ হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে তখন তিনি নিজ কর্মস্থলে যোগদান করা থেকে বিরত থাকেন। মার্চের শেষ দিকে জিয়াউর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেজর জলিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি আনুগত্য ছিন্ন করে মহান মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহন করেন। বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের নিপীড়িত মানুষদের পরাধীনতা থেকে মুক্তির পণ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা সংগ্রামে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত ১১ টি সেক্টরের মধ্যে সাহসী সেনা মেজর জলিলকে বরিশাল,ভোলা, পটুয়াখলী, ফরিদপুর এবং খুলনার কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘ নয় মাস তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন যার মধ্যে ৭ এপ্রিল খুলনা রেডিও সেন্টার মুক্ত করার অপারেশন উল্লেখযোগ্য। অত্যন্ত দক্ষতা, সাহসিকতা এবং বীরত্বপূর্ন অবদানের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের শেষ দিন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত জীবন পণ যুদ্ধ করেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জে: ওসমানীর পরিবর্তে লে: জে: জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করানো হয় জেনারেল নিয়াজীকে। অনুরুপভাবে ১৭ ডিসেম্বর খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে পাকিস্তানী বাহিনীকে সেক্টর প্রধান হিসেবে মেজর জলিলের কাছে আত্মসমর্পন না করিয়ে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল দানবীর সিং এর কাছে আত্মসমর্পন করানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় বাহিনীর নানা ঘটনাসহ এই দুটি ঘটনা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বাংলাদেশীদের সম্পদ লুন্ঠনে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাধা দেওয়ায়ই তখনকার সরকার মেজর জলিলের উপর ক্ষিপ্ত হয়। মেজর জলিল ভারতীয় বাহিনীর কর্মকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী এবং ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের সর্বাধিনায়ক জেনারেল অরোরার নিকট পত্র লিখেন যা ১৭ ডিসেম্বর তাদেরকে পৌছানো হয়।
তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল দানবির সিংকে বলতে বাধ্যে হন, “দেখা মাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।” এভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক লুন্ঠনের প্রতিবাদ করায় ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী হিসেবে মেজর জলিলকে বন্দী করে যশোর সেনা ছাউনির একটি নির্জন কক্ষে রাখা হয়।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ন অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ সাতজনকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা ছাড়াও বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মানসূচক বীর উত্তম, বীর বিক্রম এবং বীর প্রতীক উপাধি দেওয়া। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করা সবাইকে বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করা হলেও মেজর জলিলকে বঞ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী মেজর জলিল দীর্ঘ সাত মাস বন্দী থাকার পর ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মুক্তি লাভ করেন। মুক্তির পরপরই তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় সমাজতান্তিক দল (জাসদ)’ প্রতিষ্ঠা করেন। এবং তিনি জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনে মেজর জলিল ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের কারনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু পূর্ববর্তী রাজনীতিতে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেন মেজর জলিল। সরকারের ব্যর্থতা এবং কুশাসনের প্রতিবাদে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচীতে দ্বিতীয়বারের মত গ্রেফতার হন তিনি। উল্লেখ্য ঐ কর্মসূচীতে অংশ নেওয়া কয়েকশ জাসদ নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর মুক্তি পেলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তের প্রেক্ষিতে ২৩ নভেম্বর আবারও গ্রেফতার হন জলিল। সামরিক আদালতে কোন একটি মামলায় জলিলের ফাসির হুকুম হলে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য দন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তিনি মুক্তি লাভ করেন। জেলে থাকাকালীন মানব রচিত বিভিন্ন মতবাদ এবং ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করায় ক্রমে ইসলামী আন্দোলনের দিকে ধাবিত হন মেজর জলিল এবং ১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর জাসদ থেকে পদত্যাগ করে বাম রাজনীতির যাবনিকা টানেন। জাসদ থেকে পদত্যাগ করার মাত্র ১৬ দিন পর তিনি “জাতীয় মুক্তি আন্দোলন” নামে একটি ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলোর সমন্ময়ে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং লেবানন, যুক্তরাজ্য, লিবিয়া, পাকিস্তান ও ইরানে বেশ কয়েকটি ইসলামী অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এরশদ সরকারের শোষন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ১৯৮৫ সালের জানুয়ারী মাসে তাকে একমাসের জন্য গৃহবন্দী করে একবার এবং ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে দ্বিতীয়বার প্রায় তিনমাস কেন্দ্রীয় কারাগারের আটক রাখা হয়।
১৯৮৪ সালে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে মেজর জলিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের জন্য কাজ করে গেছেন। দেশ বিদেশে তিনি মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌছে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। মেজর জলিল ১৯৮৮ সালে ১১ নভেম্বর পাকিস্তান যাওয়ার পর হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৬ নভেম্বর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তৎক্ষনাৎ তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯৮৮ সালের ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০ টায় দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন মেজর এম এ জলিল। ২২ নভেম্বর মেজর জলিলের মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয় এবং যথাযথ সামরিক মর্যাদায় বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে দাফন করা হয়। মেজর জলিল প্রথম ব্যক্তি যার মৃত দেহ কবরস্থ করার মাধ্যমে মিরপুরের বুদ্ধিজীবি কবরস্থানের যাত্রা শুরু হয়।
ব্যাক্তি জীবনে তিনি বিবাহিত এবং দুজন কন্যা সন্তানের জনক। ১৯৮২ সালে তিনি টাঙ্গাইলে সায়মা আক্তারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সারাহ জলিল এবং ফারাহ জলিল নামে তাদের দুজন কন্যা সন্তান রয়েছে।
মেজর জলিল তাঁর জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা পাননি। এমনকি রাষ্ট্র কর্তৃক তাঁকে মুক্তিযোদ্ধার খেতাবটি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তবে তাঁর মৃত্যুর পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ন অবদানের জন্য মেজর এম এ জলিলের নামে ঢাকা মহানগরীর একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও বরিশালের উজিরপুরের শিকারপুর ব্রিজটি মেজর জলিলের নামে করা হয়েছে। এ ছাড়া নগরীর কাঁটাবন মোড় থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত সড়কটি এখন থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল সড়ক নামে পরিচিত হচ্ছে। বরিশাল শহরেও তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণ করা ছাড়াও বরিশালে একটি অডিটোরিয়াম ও তাঁর একটি ভাস্কর্য রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্ধি, শোষীত মানুষের পক্ষের প্রথম দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ জলিলের ৩৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৯ নভেম্বর, ২০২৫। মুক্তিযুদ্ধের অকুতভয় বীর সেনানী, ৯নং সেক্টর কমান্ডার এবং জাসদের প্রতিষ্ঠাতা এবং ঈমানদার ও সৎকর্মশীল মুসলমানের গুণে গুণান্বিত মেজর এম,এ জলিলের মৃত্যুদিনে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখকঃ শিক্ষাবিদ ও এনজিও ব্যক্তিত্ব
সূত্র:
১) কৈফিয়ত ও কিছু কথা
২) অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা