নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেটের রাজনীতির অঙ্গনে ত্যাগ, সংগ্রাম আর অটল বিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফখরুল ইসলাম ফারুক। ওসমানীনগর উপজেলা থেকে তৃণমূল রাজনীতি শুরু করে আজ তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতির দায়িত্বে—যা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার এক অনন্য স্বীকৃতি।
১৯৯৫ সালে এম এ ইলিয়াস আলী-এর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ফারুক। সেই থেকে রাজপথের লড়াই, আন্দোলন-সংগ্রাম আর দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার রাজনৈতিক পরিচয়। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, আর সেখান থেকে জেলা—প্রতিটি স্তরেই দায়িত্ব পালন করে নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে।
তার রাজনৈতিক আদর্শের মূলভিত্তি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া-এর দর্শন। পারিবারিকভাবেই বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকায় ছোটবেলা থেকেই এই আদর্শে বেড়ে ওঠা।
তবে এই পথ ছিল না সহজ। রাজনীতি করতে গিয়ে বহুবার জেল-জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। ২০০৭-০৮ বাংলাদেশের জরুরি অবস্থা-এর সময় গ্রেফতার হয়ে নির্যাতনের মুখোমুখি হন। এমনকি একসময় তাকে ক্রসফায়ারের মুখোমুখি করার জন্য সিলেটের মেজরটিলা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন তিনি। তবুও দলের আদর্শ থেকে এক চুলও সরে যাননি।
ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে গভীর শোক। কারাবন্দি অবস্থায় হারিয়েছেন নিজের মা, পরিবার থেকেও ছিলেন বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘ এই পথচলায় ত্যাগের পাল্লা ভারী হলেও, কখনো থেমে যাননি তিনি।
তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে যখন ২০১২ সালে নিখোঁজ হন তার নেতা এম এ ইলিয়াস আলী। সেই থেকে আজও প্রিয় নেতার ফেরার অপেক্ষায় আছেন তিনি। ইলিয়াস আলীর সন্ধানে সিলেট থেকে ঢাকার রাজপথ—সবখানেই আন্দোলন, মিছিল, মানববন্ধনে সক্রিয় ছিলেন, এমনকি এ কারণেও একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির কর্মসূচি থেকে গ্রেফতার হন তিনি। গ্রেফতারের পর টানা তিন মাস কারাবন্দী থাকার পাশাপাশি রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হন। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার পরিবারের সম্পত্তি দখল করে নেয় আওয়ামী সরকার। ফলে মামলার রায় বা নিজস্ব জায়গা-জমি আজও ফিরে পাননি তিনি।
এছাড়া, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সফিউল বারী বাবু তার সহধর্মিণী ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেত্রীবৃন্দ মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এলে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ভয়ে কোনো হোটেল বা বাসায় তাদের জায়গা দিতে সাহস পায়নি কেউ। এমন পরিস্থিতিতে ফখরুল ইসলাম ফারুকের বাসায় তারা আপ্যায়িত হন। যদিও সে সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, তবুও ঢাকা থেকেই ফোনের মাধ্যমে আব্দুল আহাদ খান জামাল তার বাসায় অতিথিদের রাখার ব্যবস্থা করেন। এজন্য পরবর্তীতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তার বাসায় হামলা করে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
অন্যদিকে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় হান্নান শাহ ও খন্দকার দেলোয়ার হোসেন-সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সিলেট সফরে এলে লালাবাজার এলাকায় যৌথ বাহিনী বিএনপির ওই বহরে হামলা চালায়। সেই হামলায় তিনিও আহত হন।
প্রায় তিন দশকের এই দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফারুক। চোখের জলেই যেন ফুটে ওঠে তার ত্যাগের গল্প। তবুও তার কণ্ঠে দৃঢ়তা—“দল কি দিলো, না দিলো—সেই হিসাব করি না। আমি রাজনীতি করি বিএনপিকে ভালোবেসে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শে বিশ্বাস করে।”
ত্যাগ, কষ্ট আর অবিচল আদর্শে গড়া এই রাজনৈতিক জীবনই ফখরুল ইসলাম ফারুককে আলাদা করে দিয়েছে অন্যদের থেকে—যেখানে পদ নয়, বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।